সফরে নামাজ
হানাফী মাজহাব অনুযায়ী কোন ব্যাক্তি পনের দিনের চেয়ে কম থাকার নিয়তে একশত চার কিলোমিটারের অধিক কোন দূরত্বে গমন করলে মুসাফির হিসেবে গণ্য হয়।
মুসাফিরের শাব্দিক অর্থ হলো ভ্রমণকারী বা যাত্রী। মুসাফির ব্যাক্তি চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাজগুলির ক্ষেত্রে দুই রাকাত আদায় করে। জামাতে নামাজ আদায়ের সময় ইমাম মুকীম মুসাফির নয় এমন ব্যাক্তি হলে তাকে অনুসরণ করে পুরো চার রাকাত পড়তে হয়। মুসাফির ব্যাক্তি ইমাম হলে দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবে। তবে তার অনুসারীদের মাঝে যারা মুকীম তারা সালাম না ফিরিয়ে বাকী দুই রাকাত নামাজ আদায়ের জন্য দাঁড়িয়ে যাবে।
মুসাফির ব্যাক্তি চামড়ার মোজার উপরে তিন দিন তিন রাত মাসেহ করতে পারে। রমজানের রোজা ভেঙ্গে পরবর্তীতে ক্বাযা হিসেবে আদায় করতে পারে। তবে ভ্রমণ কষ্টদায়ক না হলে রোজা রাখা উত্তম। মুসাফির ব্যাক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব হয় না, জুমার নামাজও ফরজ না। জুমার ওয়াক্তে যোহরের নামাজ আদায় করতে হবে। তবে জুমা আদায়ের সুযোগ থাকলে তা পড়তে পারে।
ওয়াক্তের শেষ সময়ে কেউ যদি ঐ ওয়াক্তের নামাজ না আদায় করে সফরে বের হয় তবে সে পরবর্তীতে ঐ নামাজ মুসাফির হিসেবে আদায় করবে অর্থাৎ চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজের ক্ষেত্রে দুই রাকাত আদায় করবে। কিন্তু যদি ওয়াক্তের শেষ সময়ে ঐ ওয়াক্তের নামাজ না আদায় করে সফর থেকে নিজ আবাসস্থানে ফিরে সেক্ষেত্রে সে মুকীম হিসেবে পুরো নামাজ আদায় করবে।
‘নি’মাতুল ইসলাম” নামক গ্রন্থে বর্নিত আছে যে, নফল নামাজসমূহ পড়ার ক্ষেত্রে সবসময় এবং সব জায়গাতেই দাঁড়িয়ে পড়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বসে পড়া জায়েজ। বসে নামাজ পড়ার সময় রুকু' করার জন্যে সামনে ঝুকতে হয় আর সেজদার জন্য কপাল মাটিতে রাখতে হয়। তবে কোন ধরনের অপারগতা না থাকা সত্ত্বেও বসে নামাজ আদায় করলে দাঁড়িয়ে আদায় করা নামাজের অর্ধেক সওয়াব অর্জন করবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নামাজের সুন্নতসমূহ এবং তারাবীহ এর নামাজ নফলের অন্তর্ভুক্ত। যাত্রাপথে অর্থাৎ শহর কিংবা গ্রামের বাইরে পশুর উপরে বর্তমান সময়ে যানবাহনে) নফল নামাজ আদায় করা জায়েজ। এক্ষেত্রে কিবলামূখী হওয়া, রুকু ও সেজদা করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে যতটুকু সম্ভব আদায় করা উচিত। সম্ভব না হলে ইশারার মাধ্যমে আদায় করবে। যেমন রুকু'র জন্য শরীরকে সামান্য সামনের দিকে ঝুকাবে আর সেজদার জন্য এর চেয়ে আরো বেশী ঝুকবে। পশুর শরীরে অনেক নাজাসাত লেগে থাকলেও তা নামাজ আদায়ের জন্য মানী' অনুপযুক্ত নয়। নফল নামাজ আদায়ের সময় কেউ ক্লান্তির কারণে লাঠিতে কিংবা মানুষ বা দেয়ালের গায়ে ঠেশ দিয়ে পড়লে তাতে নামাজ ভঙ্গ হয় না। এটা জায়েজ। তবে হাটা অবস্থায় নামাজ আদায় করা শুদ্ধ নয়৷
ফরজ ও ওয়াজিব নামাজসমূহ একেবারে বাধ্য না হলে পশুর উপরে আদায় করা জায়েজ নয়। তবে কোন উজর যুক্তিসংগত কারণ থাকলে জায়েজ হবে। যেসব উজরের কারণে পশুর উপরে নামাজ আদায় করা জায়েজ সেগুলি হলো, জান, মাল কিংবা পশুর বিপদের আশংকা থাকলে, পশু থেকে নেমে নামাজ আদায় করতে গেলে পশু কিংবা সম্পদের চুরি যাওয়ার আশংকা থাকলে, আশেপাশে হিংশ্র জন্তু জানোয়ার কিংবা শত্রু থাকলে জমিন কর্দমাক্ত হলে বর্ষন হলে,অসুস্থ ব্যাক্তির উঠানামা করতে গিয়ে রোগ বৃদ্ধির আশংকা থাকলে,সফর সঙ্গীদের অপেক্ষা না করে চলে যাওয়ার কারণে বিপদের আশংকা থাকলে,অন্যের সহযোগিতা ছাড়া পশুতে আরোহণ করা সম্ভব না হলে। সম্ভব হলে পশুকে কিবলামূখী করে থামিয়ে নামাজ আদায় করবে আর সম্ভব না হলে গন্তব্যের দিকে চলতে চলতে আদায় করবে। হাতী বা উটের পিঠে বসার জন্য পালকির মত যে ঘর থাকে তাতেও একই নিয়মে নামাজ আদায় করতে হয়। পশুকে দাঁড়া করিয়ে পালকি খুটির উপরে রাখলে টেবিল, খাট ইত্যাদির ন্যায় একই হুকুম হবে অর্থাৎ ভূমিতে পড়ার মত হবে। এমতাবস্থায় কিবলামূখী হয়ে স্বাভাবিক নিয়মে নামাজ আদায় করতে হবে। নামার সুযোগ থাকলে ফরজ নামাজগুলি অবশ্যই নিচে নেমে পড়তে হবে।
জলযানে জাহাজ, নৌকা, বোট ইত্যাদি) নামাজ আদায়ের নিয়ম হযরত জাফর তাইয়ার রা কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাবসিস্থানে ইথিওপিয়া) হিজরতের সময় শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তা হলো চলন্ত অবস্থায় জাহাজে অন্য কোন উজর না থাকলেও ফরজ ও ওয়াজিব নামাজ আদায় করা যায়। জাহাজে জামাতের সাথেও নামাজ আদায় করা যায়। চলন্ত জাহাজেও নামাজ রুকু ও সেজদা সহই আদায় করতে হয়। ইশারায় আদায় করা জায়েজ নয়। কিবলামূখী হওয়াও আবশ্যক। কিবলামূখী হয়ে নামাজ শুরু করবে পরবর্তীতে জাহাজ ঘুরার সাথে সাথে কিবলামূখী হওয়ার জন্য নিজেও ঘুরে দাঁড়াবে। জাহাজে নামাজ আদায়ের জন্য নাজাসাত থেকে পরিপূর্ন পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। ইমাম আজম আবু হানিফা(র)এর মতে,চলন্ত জাহাজে ফরজ নামাজের ক্ষেত্রে কোন ধরনের উজর না থাকা সত্ত্বেও বসে আদায় করা জায়েজ হবে।
সাগরের মাঝে নোঙর ফেলে অবস্থানরত জাহাজ যদি খুব দুলতে থাকে তবে চলন্ত জাহাজের নিয়মে আর অল্প দুললে তীরে থাকা জাহাজের নিয়মে নামাজ আদায় করতে হয়। বন্দরে অবস্থানরত জাহাজে ফরজ নামাজ বসে আদায় করা যায় না। যদি জাহাজ থেকে তীরে নামা সম্ভব হয় তবে জাহাজে দাঁড়িয়ে আদায় করাটাও সহীহ (শুদ্ধ) হবে না। স্থলে নেমে আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি জান মালের ক্ষতির আশংকা থাকে কিংবা জাহাজের বন্দর ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তবে জাহাজেই দাঁড়িয়ে আদায় করা জায়েজ হবে।
ইবনে আবেদিন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন যে “দুই চাকা বিশিষ্ট গাড়ি যা পশুর সাথে না বাঁধলে স্থিরভাবে সোজা হয়ে থাকতে পারে না তাতে নামাজ আদায়ের নিয়ম পশুর উপরে নামাজ আদায়ের নিয়মের অনুরূপ। তা থামা অবস্থায় হোক কিংবা চলন্ত অবস্থায়। চার চাকা বিশিষ্ট গাড়িতে থেমে থাকা অবস্থায় নামাজ আদায়ের নিয়ম টেবিল, খাট ইত্যাদির উপরে আদায়ের নিয়মের অনুরূপা উপরে উল্লেখিত যেসব কারণে পশুর উপরে ফরজ নামাজ আদায় করা জায়েজ ঐসব কারণে গাড়িতেও ফরজ নামাজ আদায় করা যায়। এক্ষেত্রে গাড়ি থামিয়ে কিবলামূখী হয়ে আদায় করতে হয়। যদি গাড়ি থামানো সম্ভব না হয় তবে চলন্ত জাহাজের নিয়মে আদায় করতে হয়”। চলন্ত অবস্থায় যদি কিবলামূখী হওয়া সম্ভব না হয় তাহলে শাফী' মাজহাবের তাক্বলীদ (অনুসরণ) করে দুই ওয়াক্তের নামাজকে জাম’ (একত্রে) করবে। এটাও যদি সম্ভব না হয় তখন তার জন্যে কিবলামূখী হওয়ার শর্ত রহিত হয়। চেয়ারে আসনে বসে ইশারায় নামাজ আদায় করা কারো জন্যেই জায়েজ নয়। বাসে, বিমানে নামাজ আদায় করার পদ্ধতি গাড়িতে আদায়ের নিয়মের অনুরূপ।
মুসাফির অবস্থায় ফরজ ও ওয়াজিব নামাজসমূহ বাধ্য না হলে পশুর উপরে আদায় করা উচিত নয়। বহনকারী মাধ্যমকে থামিয়ে কিবলামূখী হয়ে দাঁড়িয়ে আদায় করা উচিত। এজন্যে যাত্রা শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় তদবির (ব্যাবস্থা নেয়া উচিত।
মুসাফির ব্যাক্তি ট্রেনে কিংবা ফেরীতে ফরজ নামাজ আদায়ের সময় কিবলামূখী হয়ে আদায় করবে এবং সম্ভব হলে সেজদার স্থানের পাশে একটি কম্পাস রাখবে। ফেরী বা ট্রেনের দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেকেও কিবলার দিকে ফিরিয়ে রাখতে হবে। বক্ষ কিবলার দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হলে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যাবে। বাসে ট্রেনে ঝড়ের সময় সাগরে কিবলামূখী হওয়া সম্ভব না হলে ফরজ নামাজ আদায় করাও শুদ্ধ হয় না। যারা এ অবস্থার সম্মুখীন তারা যতক্ষন সফরে থাকবেন ততক্ষন শাফী' মাজহাবের তাক্বলীদ করে যোহরের সাথে আছরের নামাজকে এবং মাগরিবের সাথে এশার নামাজকে জাম’(একত্রিত করে আদায় করতে পারবেন। অর্থাৎ মুসাফির অবস্থায় উল্লেখিত দুই ওয়াক্তের নামাজকে একসাথে পরপর আদায় করে নিবে। কেননা শাফী' মাজহাব অনুযায়ী আশি কিলোমিটারের অধিক পথ ভ্রমণকারী মুসাফির হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সে আছরকে যোহর নামাজের ওয়াক্তে ও এশার নামাজকে মাগরিবের ওয়াক্তে তাক্বদীম করে (এগিয়ে এনে) আদায় করতে পারে। কিংবা সুবিধা অনুযায়ী যোহরকে আছরের নামাজের ওয়াক্তে ও মাগরিবকে এশার নামাজের ওয়াক্তে তা’খির (বিলম্বিত করেও আদায় করতে পারে। একারণে হানাফী মাজহাবের অনুসারী কোন ব্যাক্তির পক্ষে যদি মুসাফির অবস্থায় কিবলামূখী হয়ে নামাজ আদায় করা সম্ভব না হয় তবে দিনের বেলা (দুপুরের পরে কোথাও যাত্রা বিরতি হলে যোহরের নামাজ আদায়ের সাথে সাথে আছরের নামাজও আদায় করে নিবে। আর সন্ধ্যার পরে রাতে যখনি যাত্রা বিরতি পাবে তখনি প্রথমে মাগরিব ও পরেই এশার নামাজ আদায় করে নিবে। শাফী' মাজহাবের অনুসরণ করে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে নিয়্যাতের সময়ে তা উল্লেখ করতে হবে অর্থাৎ মনে মনে ‘আমি শাফী' মাজহাবের অনুসরণ করে নামাজ আদায় করছি' বলবে। সফরে বের হওয়ার পূর্বে কিংবা সফর সমাপ্তির পরে দুই ওয়াক্তের নামাজকে জাম’(একত্রিত) করে আদায় করা জায়েজ নয়৷
